soundscape_logo
Kolkata Soundscapes
 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছেলেবেলা (নির্বাচিত অংশ)

 

  

 

আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায় | শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটছে তখন ছড়্‌ছড়্‌ করে ধুলো উড়িয়ে , . . .  হেঁইয়ো শব্দে চমক লাগিয়ে দিত পায়ে-চলতি মানুষকে|

 

মাইনে করা যে দিনু স্যাকরা গলির পাশের ঘরে বসে হাপর ফোঁস ফোঁস করে বাড়ির ফরমাশ খাটত সে আসছে খাতাঞ্চিখানায় কানে-পালখের-কলম-গোঁজা কৈলাস মুখুজ্জের কাছে পাওনার দাবি জানাতে ; উঠোনে বসে টং টং আওয়াজে পুরোনো লেপের তুলো ধুনছে ধুনুরি | বাইরে কানা পালোয়ানের সঙ্গে মুকুন্দলাল দারোয়ান লুটোপুটি করতে করতে কুস্তির প্যাঁচ কষছে | চটাচট শব্দে দুই পায়ে লাগাচ্ছে চাপড় , ডন ফেলছে বিশ-পঁচিশ বার ঘন ঘন | ভিখিরির দল বসে আছে বরাদ্দ ভিক্ষার আশা করে |…

 

চলার পথটা কাটা হয়েছে আমারই খেয়ালে | সেই পথে চলেছে পালকি দূরে দূরে দেশে দেশে , সে-সব দেশের বইপড়া নাম আমারই লাগিয়ে দেওয়া | কখনো বা তার পথটা ঢুকে পড়ে ঘন বনের ভিতর দিয়ে | বাঘের চোখ জ্বল্‌জ্বল্‌ করছে , গা করছে ছম্‌ছম্‌ | সঙ্গে আছে বিশ্বনাথ শিকারী , বন্দুক ছুটল দুম্‌ , ব্যাস্‌ সব চুপ | তার পরে এক সময়ে পালকির চেহারা বদলে গিয়ে হয়ে ওঠে ময়ূরপঙ্খি , ভেসে চলে সমুদ্রে , ডাঙা যায় না দেখা | দাঁড় পড়তে থাকে ছপ্‌ছপ্‌ ছপ্‌ছপ্‌ , ঢেউ উঠতে থাকে দুলে দুলে ফুলে ফুলে | মাল্লারা বলে ওঠে , সামাল সামাল , ঝড় উঠল |

 

 

সিঙ্গিমামা কাটুম

আন্দিবোসের বাটুম

উলুকুট ঢুলুকুট ঢ্যামকুড়কুড়

আখরোট বাখরোট খট খট খটাস

পট পট পটাস |

 

 

তখনও ইংরেজি শব্দের বানান আর মানে-মুখস্থর বুক-ধড়াস সন্ধেবেলার ঘাড়ে চেপে বসে নি |

 

 

 

 

ব্রজেশ্বরের কাছে সন্ধেবেলায় দিনে দিনে শুনেছি কৃত্তিবাসের সাতকাণ্ড রামায়ণটা | সেই পড়ার মাঝে মাঝে এসে পড়ত কিশোরী চাটুজ্যে | সমস্ত রামায়ণের পাঁচালি ছিল সুরসমেত তার মুখস্থ | সে হঠাৎ আসন দখল করে কৃত্তিবাসকে ছাপিয়ে দিয়ে হু হুকরে আউড়িয়ে যেত তার পাঁচালির পালা | ওরে রে লক্ষণ , এ কী অলক্ষণ , বিপদ ঘটেছে বিলক্ষণ | তার মুখে হাসি , মাথার টাক ঝক ঝক করছে , গলা দিয়ে ছড়া-কাটা লাইনের ঝরনা সুর বাজিয়ে চলছে , পদে পদে শব্দের মিলগুলো বেজে ওঠে যেন জলের নিচেকার নুড়ির আওয়াজ |

 

 

 

আমাদের সেকালে দিন ফুরলে কাজকর্মের বাড়তি ভাগ যেন কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ত শহরের বাতি-নেবানো নীচের তলায় | ঘরে-বাইরে সন্ধ্যার আকাশ থম থম করত | ইডেন গার্ডেনে গঙ্গার ধারে শৌখিনদের হাওয়া খাইয়ে নিয়ে ফেরবার গাড়িতে সইসদের হৈ হৈ শব্দ রাস্তা থেকে শোনা যেত | চৈৎ-বৈশাখ মাসে রাস্তায় ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত ‘ বরীফ ‘ | হাঁড়িতে বরফ-দেওয়া নোনতা জলে ছোটো ছোটো টিনের চোঙে থাকত যাকে বলা হোত কুলফির বরফ , এখন যাকে বলে অইস কিংবা আইসক্রীম | রাস্তার দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই ডাকে মন কী রকম করত তা মনই জানে | আর-একটা হাঁক ছিল ‘ বেলফুল ‘ |

 

 

 

ছুটির রবিবার | আগের সন্ধেবেলায় ঝিঁঝি ডাকছিল বাইরের দক্ষিণের বাগানের ঝোপে , গল্পটা ছিল রঘু ডাকাতের | ছায়া-কাঁপা ঘরে মিটমিটে আলোতে বুক করছিল ধুক ধুক | পরদিন ছুটির ফাঁকে পালকিতে চড়ে বসলুম | সেটা চলতে শুরু করল বিনা চলায় , উড়ো ঠিকানায় , গল্পের জালে জড়ানো মনটাকে ভয়ের স্বাদ দেবার জন্যে | নিঝুম অন্ধকারের নাড়িতে যেন তালে তালে বেজে উঠছে বেহারাগুলোর হাঁই হুই হাঁই হুই , গা করছে ছম ছম | ধূ ধূ করে মাঠ , বাতাস কাঁপে রোদ্দুরে | দূরে ঝিক ঝিক করে কালিদিঘির জল | চিক চিক করে বালি | ডাঙার উপর থেকে ঝুঁকে পড়েছে ফাটল-ধরা ঘাটের দিকে ডালপালা-ছড়ানো পাকুড় গাছ |গল্পের আতঙ্ক জমা হয়ে আছে না-জানা মাঠের গাছতলায় , ঘন বেতের ঝোপে | যত এগোচ্ছি দুর দুর করছে বুক | বাঁশের লাঠির আগা দুই-একটা দেখা যায় ঝোপের উপর দিকে | কাঁধ বদল করবে বেহারাগুলো ঐখানে | জল খাবে , ভিজে গামছা জড়াবে মাথায় | তার পরে ?

‘ রে রে রে রে রে রে! ‘

 

 

 

ঘণ্টা বাজে দশটার | বড়ো রাস্তা থেকে মন-উদাস-করা ডাক শোনা যায় কাঁচা-আম-ওয়ালার | বাসনওয়ালা ঠং ঠং আওয়াজ দিয়ে চলছে দূরের থেকে দূরে |

 

 

 

ঐখানে মেয়েরা বসত পিতলের গামলা-ভরা কলাইবাঁটা নিয়ে | টিপে টিপে টপ্‌টপ্‌ করে বড়ি দিত চুল শুকোতে শুকোতে;

 

 

 

 

সন্ধেবেলায় ফিরে যেতুম বাড়িতে |. . . এক-একদিন বাড়ির আঙিনায় আসে ভালুক-নাচ-ওয়ালা | আসে সাপুড়ে সাপ খেলাতে | এক-একদিন আসে ভোজবাজিওয়ালা , একটু দেয় নতুনের আমেজ | আমাদের চিৎপুর রোডে আজ আর ওদের ডুগ্‌ডুগি বাজে না | 

 

 

 

রাত একটা হয় , দুটো হয় | সামনের বড়ো রাস্তায় রব ওঠে ,

‘ বলো হরি হরিবোল | ‘

 

 

 

 

সবচেয়ে খারাপ লাগত পাড়ার কোনো বাড়ি থেকে পিঁজরেতে-বাঁধা কোকিলের ডাক |