soundscape_logo
Kolkata Soundscapes
 

হুতোম প্যাঁচার নকশা

হুতোম প্যাঁচার নকশা, ১৮৬২ (নির্বাচিত অংশ)

কালীপ্রসন্ন সিংহ

 

কলিকাতা সহরের চার দিকেই ঢাকের বাজ্‌না শোনা যাচ্চে, চড়্‌কীর পিঠ সড়্‌ সড়্‌ কচ্চে, কামারেরা বাণ, দশলকি, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তুত কচ্চে –; সর্ব্বাঙ্গে গয়না,পায়ে নূপুর, মাতায় জরির টুপি, কোমোরে চন্দ্রহার, সিপাই পেড়ে ঢাকাই সাড়ি মালকোচা করে পরা, তারকেশ্বরে ছোবান গাম্‌চা হাতে বিল্বপত্র বাঁদাসূতা গলায় যত ছুতর, গয়লা, গন্ধবেণে ও কাশাঁরির আনন্দের সীমা নাই—“আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজোন!”…

এদিকে দুলে বেয়ারা , হাড়ি ও কাওরারা নূপুর পায়ে উত্তরি সূতা গলায় দিয়ে। নিজ নিজ বীরব্রতের ও মহত্ত্বের স্তম্ভস্বরূপ বাণ ও দশলকি হাতে করে প্রত্যেক মদের দোকানে, বেশ্যালয়ে ও লোকের উঠানে ঢাকের সংগতে নেচে ব্যাড়াচ্চে। ঢাকীরা ঢাকের টোয়েতে চামর, পাখির পালক, ঘন্টা ও ঘুমুর বেঁধে পাড়ায় পাড়ায় ঢাক বাজিয়ে সন্ন্যাসী সংগ্রহ কচ্চে; গুরু মশায়ের পাঠশাল বন্দ হয়ে গিয়েছে—ছেলেরা গাজনতলাই বাড়ি করে তুলেচে; আহার নাই, নিদ্রা নাই; ঢাকের পেচোনে পেচোনে রপ্টে রপ্টে ব্যাড়াচ্চে; কখন “বলে ভদ্দেশ্বরে শিবো মহাদেব” চিৎকারের সঙ্গে যোগ দিচ্চে, কখন ঢাকের টোয়ের চামর ছিঁড়্‌ছে, কখন ঢাকের পেছনটা দুম্‌ দুম্‌ করে বাজাচ্চে—বাপ মা শশব্যস্ত, একটা না ব্যায়রাম কল্লে হয়। …

এ দিকেআমাদের বাবুদের গাজনতলা লোকারণ্য হয়ে উঠলো, ঢাক বাজতে লাগ্‌লো, শিবের কাছে মাথা চালা আরম্ভ হল,…

গাজন তলায় সজোরে ঢাক বেজে উঠলো, সকলে উচ্চ স্বরে ‘ভদ্দেশ্বরে শিবো মহাদেব” বলে চীৎকার কর্‌তে লাগ্‌লো; বাবু শিবের সম্মুখে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম কল্লেন। …

এ দিকে সহরে সন্ধ্যাসূচক কাঁশোর ঘন্টার শব্দ থাম্‌ল। সকল পথের সমুদায় আলো  জ্বালা হয়েছে। “বেল ফুল!” “বরফ!” “মালাই!” চীৎকার শুনা যাচ্চে। …

সৌখীন কুটিওয়ালা মুখে হাতে জল দিয়ে জলযোগ করে সেতারটি নিয়ে বসেচেন। পাসের ঘরে ছোট ছোট ছেলেরা চীৎকার করে—বিদ্দেসাগরের বর্ণ পরিচয় পড়্‌চে। …

শোভাবাজারে রাজাদের ভাঙ্গা বাজারে মেচুনীরা প্রদীপ হাতে করে ওঁচা পচা মাচ ও লোনা ইলিস নিয়ে ক্রেতাদের—“ও গামচা কাঁদে ভালো মাচ নিবি?” ও “খেংরা গুপো মিন্‌সে চার আনা দিবি” বলে আদর কচ্চে—মধ্যে মধ্যে দু এক জন রসিকতা জানাবার জন্য মেচুনী ঘেঁটিয়ে বাপান্ত খাচ্চেন। রেস্তহীন গুলিখোর, গেঁজেল ও মাতালরা লাটি হাতে করে কানা সেজে “অন্ধ ব্রাহ্মণকে কিছু দান কর দাতাগণ,” বলে ভিক্ষা করে মৌতাতের সম্বল কচ্চে; এমন সময় বাবুদের গাজন তলায় সজোরে ঢাক বেজে উঠ্‌লো, “বলে ভদ্দেশ্বর শিবো” চীৎকার হতে লাগ্‌ল; গোল উঠ্‌লো, এ বারে ঝুল সন্ন্যাস।

…           …           …           …           …           …

এ দিকে গির্জ্জার ঘড়িতে টুং টাং ঢং টুং টাং ঢং, করে রাত চারটে বেজে গ্যালো—বারফট্‌কা বাবুরা ঘরমুখ হয়েচে। উড়ে বামুনরা ময়দার দোকানে ময়দা পিস্তে আরম্ব করেচে। রাস্তার আলোর আর তত তেজ নাই। ফুরফুরে হাওয়া উঠেচে। বেশ্যালয়ের বারান্ডার কোকিলেরা ডাক্তে আরম্ভ করেচে; দু এক বার কাকের ডাক, কোকিলের আওয়াজ ও রাস্তার বেকার কুকুর গুলোর খেউ খেউ রব ভিন্ন এখনও এই মহানগর যেন লোক শূন্য। ক্রমে দেখুন—“রামের মা চল্‌তে পারে না”, “ওদের ন বৌটা কি বজ্জাত মা,” “মাগি যে জক্কী” প্রভৃতি নানা কথার আন্দোলনে দুই এক দল মেয়ে মানুষ গঙ্গা স্নান কত্তে বেরিয়েছেন। চিতপুরের কসাইরা মটন চাপের ভার নিয়ে চলেছে। পুলিষের সার্জ্জন, দারোগা, জমাদার প্রভৃতি গরিবের যমেরা রোঁদ সেরে মস মস করে থানায় ফিরে যাচ্চেন; …

গুপুস্‌ করে তোপ পড়ে গ্যাল! কাকগুলো “কা কা” করে বাসা ছেড়ে উড়বার উজ্জুগ কল্লে। দোকানিরা দোকানের ঝাপ্তাড়া খুলে গন্ধেশ্বরীকে প্রণাম করে দোকানে গঙ্গাজলের ছড়া দিয়ে হুকোর জল ফিরিয়ে তামাক খাবার উজ্জুগ কচ্ছে। ক্রমে ফরসা হয়ে এলো—মাচের ভারিরা দৌড়ে আস্‌তে লেগেচে—মেচুনিরা ঝকড়া কত্তে কত্তে তার পেচু পেচু দৌড়েছে। …

ক্রমে গির্জ্জের ঘড়িতে ঢং ঢং ঢং করে সাতটা বেজে গেলো। সহরে কান পাতা ভার। রাস্তায় লোকারণ্য, চার দিকে ঢাকের বাদ্যি, ধূনোর ধোঁ, আর মদের দুর্গন্ধ। সন্ন্যাসীরা বাণ, দশলকি, সুতোশোন, সাপ, ছিপ ও বাঁশ ফুড়ে এক বারে মরিয়া হয়ে নাস্তে নাস্তে কালীঘাট থেকে আস্‌চে। বেশ্যালয়ের বারান্ডা ইয়ার গোচের ভদ্র লোকে পরিপূর্ণ, সকের দলের পাঁচালি ও হাপ্‌ আক্‌ড়ায়ের দোয়ার, গুল গার্ডনের মেম্বরই অধিক,– এঁরা গাজোন দ্যাখবার জন্য ভোরের ব্যালা এসে জমেছেন।

…           …           …           …           …           …

 

চিঠপুরের বড় রাস্তা মেঘ কল্লে কাদা হয়—ধুলোয় ধুলো, তার মধ্যে ঢাকের গটরার সঙ্গে গাজন বেরিয়েচে। প্রথমে দুটো মুটে একটা বড় পেতলের পেটা ঘড়ি বাঁশে বেঁদে কাঁদে করেছে—কতকগুলো ছেলে মুগুরের বাড়ি বাজাতে বাজাতে চলেচে—তার পেচোনে এলো মেলো নিশেনের শ্রেণী। মধ্যে হাড়িরা দল বেঁদে ঢোলের সংগেতে “ভোলা বোম্‌ ভোলা বড় রঙ্গিলা লেংটা ত্রিপুরারী শিরে জটাধারী ভোলার গলে দোলে হাড়ের মালা,” ভজন গাইতে গাইতে চলেচে। তার পেচনে বাবুর অবস্থামত তকমাওয়ালা দরোয়ান, হরকরা, সেপাই। মধ্যে সর্ব্বাঙ্গে ছাই ও খড়ি মাখা, টিনের সাপের ফণার টুপি মাথায় শিব ও পার্ব্বতী সাজা সং। তার পেচনে কতকগুলো সন্ন্যাসী দশলকী ফুঁড়ে ধুনো পোড়াতে পোড়াতে নাচ্‌তে নাচ্‌তে চলেচে। পাশে বেণোরা জিবে হাতে বাণ ফুঁড়ে চলেচে। লম্বা লম্বা ছিপ, উপরে শোলার চিংড়ি মাছ বাধা। সেটকে সেট ঢাকে ড্যানাক্‌ ড্যানাক্‌ করে রং বাজাচ্চে। পেচনে বাবুর ভাগনে, ছোট ভাই বা পিস্‌তুতো ভেয়েরা গাড়ি চড়ে চলেচেন—তাঁরা রাত্রি তিনটের সময় উঠেচেন, চোক লাল টক্‌ টক্‌ কচ্চে, মাথা ভবানীপুরে ও কালিঘেটে ধূলোয় ভরে গিয়েছে। দর্শকেরা হাঁ করে গাজন দেখ্‌চেন, মধ্যে বাজ্‌নার শব্দে ঘোঁড়া খেপেচে—হুড় মুড় করে দোকানে কেউ খানার উপর পড়চেন, রৌদ্রে মাথা ফেটে যাচ্চে—তথাপি নড়চেন না।