soundscape_logo
Kolkata Soundscapes
 

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জোড়াসাঁকোর ধারে, (নির্বাচিত অংশ)

 

 

এ দিকে আবার নানারকম শব্দও আসে কানে, দুপুর হতেই গলির মোড়ে শব্দ হল ঠং ঠং, ‘বাসন চাই, বাসন!’- শব্দ চলে গেল দূরে। তার পরে এল ‘চুড়ি চাই, খেলনা চাই’।

প্রায়ই মায়েদের মহলে তাদের ডাক পড়ে, ঝুড়ি ঝুড়ি নানা রঙের কাচের চুড়ি সাজিয়ে বসে এসে। একরকমের মজার খেলনা থাকে তাদের ঝুড়িতে; টিনের এতটুকু এতটুকু মাছ আর চুম্বকের কাঠি। মাছটি জলে ভাসিয়ে চুম্বকের কাঠি দিয়ে টানলেই মাছও সঙ্গে সঙ্গে জলের উপর চলতে থাকে। এমন লোভ হয় ঐ খেলনাটার জন্য। বাড়ির অন্য সব ছেলেমেয়েরা প্রায়ই পায় সেই খেলনা। আমি পাই ক্কচিৎ কখনও। আমাকে কেউ যে খেয়ালই করে না তেমন। তার পর বেলা পড়ে এলে গরমের দিনে বরফওয়ালা হেঁকে যায়, ‘বরিফ বরিফ চাই, বরিফ- কুলফি বরিফ।’ – জ্যোতিকাকামশায় লিখেছিলেন একটা গান-

              ‘বরিফ বরিফ’ ব’লে

                     বরফওয়ালা যান।

       গা ঢালো রে,       নিশি আগুয়ান।

              ‘বেল ফুল বেল ফুল’

                     ঘন হাঁকে          মালীকুল-

 

সন্ধ্যাবেলার শব্দ হচ্ছে ঐ বেলফুল। ‘বেলফুল, চাই বেলফুল’ হাঁকতে হাঁকতে শব্দ গলির এ দিক থেকে ও দিক চলে যায়। তাদের ডেকে বেলফুল কেনে দাসীরা, মালা গাঁথেন মেয়েরা।

ভরসন্ধেবেলা মুশকিল-আসান আসে খিড়কির দরজায় চেরাগ হাতে, লম্বা দাড়ি, পিদিম জ্বলছে মিটমিট করে। বারান্দা থেকে দেখি তার চেহারা। দোরগোড়ায় এসেই হাঁক দেয়, ‘মুশকিল আসান, মুশকিল আসান!’ দপ্তরে বরাদ্দ থাকে, মুশকিল; আসান এলেই তাকে চাল পয়সা যা হয় দিয়ে দেয়; সে আবার হাঁক দিতে দিতে চলে যায়। আরো একটি শব্দ, সেটি এখনো থেকে থেকে কানে বাজে। দুপুরের সব যখন শোনশান, কোনো সাড়াশব্দ নেই কোথাও তখন শব্দ কানে আসে ‘কুয়োর ঘটি তোলা’।

মনে হয় ঠিক যেন অদ্ভুত কোন্‌ একটি পাখি ডেকে চলেছে। রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে দেখি ঘনকালো তেঁতুল গাছের মাথা। দাসীরা বলে বংশের সকলের নাড়ী পোঁতা আছে তার তলায়। মাঝে মাঝে ছাতের উপরে ভোঁদড় চলে বেড়ায়, সেই চলার শব্দে গল্প তৈরি হয় মনের ভিতরে; ব্রহ্মদত্যি হাঁটছে, জটেবুড়ি কাশছে। জটেবুড়ি সত্যিই ছিল, লাঠি ঠক ঠক করে আসত; ময়ূরে তার চোক উপড়ে নিয়েছিল। ‘ক্ষীরের পুতুল’ এ যে ষষ্ঠীবুড়ি এঁকেছি ঠিক সেইরকম ছিল সে দেখতে।

ও দিকে নীচে রাত দশটার পর নন্দ ফরাসের ঘরে নোটো খোঁড়ার বেহালা শুরু হয়। একটাই সুর, অনেক রাত্তির অবধি চলে একটানা। বেহালা যেন সুরে এক দুই মুখস্থ করছে; এক, দুই, তিন, চার; এক, দুই, তিন, চার। ঐ থেকে পরে আমি একটা যাত্রার সুর দিয়েছিলুম। বাবামশায়ের বৈঠক ভাঙলে, নন্দ ফরাসের ঘরে বৈঠক বসে- ছিরু মেথর, নোটো খোঁড়া, আরো অনেকের। ভোরবেলা বাড়ির সামনে ঘোড়া মলে টপ্‌ টপ্‌ ঠপ্‌ ঠপ্‌। কাকপক্ষী ডাকার আগে এই শব্দ শুনেই ঘুম ভাঙে আমার। রোজ ঘুমোবার আগে আর ঘুম ভেঙে এই দুটি শব্দ শুনি- বেহালার এক, দুই, তিন, চার; আর ঘোড়া মলার টপ্‌ টপ্‌ ঠপ্‌ ঠপ্‌।

তখন এক-একটা সময়ের এক-একটা শব্দ ছিল। এখন সেই শব্দ আর নেই, সব মিলিয়ে যেন কোলাহল চারি দিকে। ট্যাক্সির ভোঁ-ভোঁ, দোকানদারের চীৎকার, রাস্তার হট্টগোল, এ-সব ঘরের কোণেও কান পাতা দায়। তার উপরে জুটেছে আজকাল মাথার উপরে উড়োজাহাজের ঘড়ঘড়ানি, রেডিওর ভনভনানি, আরো কত কী! তেতলার ছাদে জ্যোতিকাকামশায়ের পিয়ানোর সুর, রবিকা’র গান, জ্যাঠামশায়ের হাসির ধমক, কোথায় চলে গেল সে-সব!